বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ১২, আহত তিন শতাধিক; হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমেরিকাকে টানবেন কি না, ভাবছেন ট্রাম্প

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াধের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ গেল অন্তত ১২ জনের। আহত তিন শতাধিক। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। হামলার জন্য প্রতিবেশী ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের দায়ী করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠায় যুদ্ধে সরাসরি আমেরিকাকে সামিল করার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

রবিবার ভোরে সৌদি অসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ হতাহতের এই পরিসংখ্যান জানিয়েছে। এক আঞ্চলিক আধিকারিকের দাবি, রিয়াধের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ উড়ানের ৩ ও ৪ নম্বর টার্মিনাল-সহ ভবনসমষ্টিতে আছড়ে পড়ে একটি ক্ষেপণাস্ত্র। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বললেও পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি তিনি।

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক এবং দু’জন বাংলাদেশি রয়েছেন। এ ছাড়া প্যালেস্টাইন, আমেরিকা, মিশর, জর্ডন, সিরিয়া ও সুদানের এক জন করে নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে।

যুদ্ধে নামবে আমেরিকা?

রিয়াধে হামলার পর ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি অভিযানে আমেরিকা যোগ দেবে কি না, সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি ট্রাম্প। তাঁর কথায়, “আমরা যোগ দিতে পারি। বিষয়টি খতিয়ে দেখব। সাম্প্রতিক হামলার খবর আমরা এইমাত্র পেয়েছি। তাই সিদ্ধান্ত নেব। আমরা খুব দ্রুত পদক্ষেপ করি।”

মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও হামলার তীব্র নিন্দা করেছেন। তাঁর কথায়, এই ধরনের হামলা “নিন্দনীয়” এবং “এগুলি এখনই বন্ধ করতে হবে”।

বিমানবন্দরে তখন আতঙ্কের ছবি। বিমানে ওঠার অপেক্ষায় থাকা এক যাত্রী জানিয়েছেন, হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দ শুনে চার দিকে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। আর এক প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেছেন, নিজের চোখের সামনেই ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত এবং মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা দেখেছেন।

অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে থাকা ওই যাত্রী সংবাদ সংস্থা এএফপি-কে বলেন, “আমি ৪০৩ নম্বর গেটে ছিলাম। দেখলাম, ৪০১ নম্বর গেটে আঘাত হানল। নিজের চোখের সামনে আহত মানুষদের দেখেছি। সবাই ছুটছিলেন।”

এক আহত ব্যক্তির আত্মীয় জানিয়েছেন, বিস্ফোরণে ছিটকে আসা কাচের টুকরোয় তাঁর কাঁধ ও বাহু ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

হামলার আঁচ ছড়িয়েছে রিয়াধের বাইরেও। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেও একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা গোলা এসে পড়েছে। একের পর এক হামলায় রিয়াধের বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিকল্প বিমানবন্দর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দাম্মাম।

এই হামলা নিয়ে হুথিদের তরফে তাৎক্ষণিক কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে শনিবার তারা অভিযোগ করেছিল, ইয়েমেনের রাজধানী সানায় হুথি-নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে রিয়াধের স্কুলগুলিতে এক সপ্তাহের জন্য দূরশিক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি শিক্ষামন্ত্রক।

যুদ্ধের আগুন ছড়াচ্ছে

সৌদি আরবে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমেই বেড়েছে। চলতি সপ্তাহেই এর আগে দু’বার রিয়াধ বিমানবন্দরে হামলা হয়েছিল। সেই দুই ঘটনায় চারজন নিহত হন, আহত হন আরও কয়েকজন। একটি বিমানও গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকার ও হুথিদের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতের জেরে যে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, জুলাইয়ে তা ভেঙে পড়ে। তার পর থেকে সৌদি বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা এবং তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্য করে বারবার হামলা চালিয়েছে হুথিরা।

এ বার সংঘাতের কেন্দ্রে উঠে এসেছে বাব আল-মান্দাব প্রণালী। লোহিত সাগর থেকে এডেন উপসাগর হয়ে ভারত মহাসাগরে যাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন লড়াই। ইয়েমেনের রাষ্ট্রপুঞ্জ-স্বীকৃত সরকারের সহযোগী বাহিনীগুলির দাবি, হুথিদের হাত থেকে প্রণালীটি পুনর্দখলের অভিযান এগোচ্ছে। তবে কতটা এলাকা পুনর্দখল করা সম্ভব হয়েছে, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সামনে এসেছে।

হুথিদের এক মুখপাত্রের দাবি, এডেনভিত্তিক সৌদি-সমর্থিত সরকারের বাহিনীর বিরুদ্ধে বিপুল সংখ্যায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, কামান ও ভারী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, হামলায় ২২টিরও বেশি সাঁজোয়া যান ধ্বংস হয়েছে এবং কয়েকজন কমান্ডার-সহ কয়েক ডজন মানুষ নিহত বা আহত হয়েছেন।

ওই মুখপাত্র আরও দাবি করেছেন, সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর নিহত ও আহতদের সরিয়ে নিয়ে যেতে ৩০টিরও বেশি অ্যাম্বুল্যান্স এডেনে পৌঁছেছে।

অন্য দিকে, ইয়েমেনে সৌদি রাষ্ট্রদূত মহম্মদ আল-জাবের প্রণালী পুনর্দখলের দাবিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, “প্রত্যেক ইয়েমেনি ও আরবের জন্য এ এক বরকতময় শুক্রবার এবং বিজয়ের দিন। বাব আল-মান্দাবকে হুথি সন্ত্রাসী মিলিশিয়ার অবশিষ্ট সদস্যদের হাত থেকে মুক্ত করা হয়েছে।”

তবে এই দাবি নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। প্রণালীর মাঝখানে অবস্থিত পেরিম বা মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে দু’পক্ষই। প্রায় পাঁচ বর্গমাইল, অর্থাৎ ১৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দ্বীপটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লোহিত সাগর থেকে এডেন উপসাগর হয়ে যাওয়া জাহাজের গতিবিধির উপর নজর রাখার ক্ষেত্রে এর অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

দক্ষিণ ইয়েমেনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি সাদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল বা এসটিসি-র সভাপতি আইদারুস আল-জুবাইদির দাবি, পেরিম দ্বীপ এবং সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকা হুথিদের হাত থেকে পুনর্দখল করা হয়েছে।

কিন্তু রাষ্ট্রপুঞ্জ-স্বীকৃত সরকারের সামরিক মুখপাত্র ওয়াদ্দাহ আল-দাবিশের বক্তব্য, এখনও পর্যন্ত এলাকার প্রায় অর্ধেক পুনর্দখল করা সম্ভব হয়েছে। তাঁর দাবি, প্রণালীর আশপাশে হুথিদের তৈরি প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং কয়েক হাজার হুথি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। দ্বীপটিতে এখনও প্রায় ৫০০ হুথি যোদ্ধা মোতায়েন রয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রণালী পুনর্দখলের খবরকে সামনে রেখে সৌদি আরব দেখাতে চাইছে, সপ্তাহের গোড়ায় শুরু হওয়া স্থল অভিযান সাফল্যের মুখ দেখছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা বিবরণে যে ফারাক রয়েছে, তাতে প্রকৃত পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের আশঙ্কা

এমন পরিস্থিতিতেই ইয়েমেনে রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষ দূত হান্স গ্রুন্ডবার্গ নিউ ইয়র্কে নিরাপত্তা পরিষদকে সতর্ক করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ ইয়েমেন আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। আর এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে নারী ও শিশুদের।

এর আগে, প্রায় দু’সপ্তাহ আগে বাব আল-মান্দাব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছিল হুথিরা। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, এই জলপথ দিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও বাণিজ্যিক জাহাজকে যেতে দেওয়া হবে না। ইয়েমেন থেকে সৌদি প্রভাব সরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই তাদের লড়াই। সেই সংঘাতের অংশ হিসেবেই রিয়াধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ।

তবে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর অগ্রগতি নিয়ে আগেও আগেভাগে সাফল্যের দাবি সামনে এসেছে। ফলে পেরিম দ্বীপ ও প্রণালীর সংলগ্ন ভূখণ্ড সত্যিই কতটা পুনর্দখল করা গিয়েছে, তা নিয়ে সতর্ক থাকছেন পর্যবেক্ষকেরা।

বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া শুধু সৌদি আরবের সামরিক সাফল্যের প্রশ্ন নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলের জন্যও এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সেখানে হুথিদের প্রভাব কমানো পশ্চিমি দেশগুলির কাছেও বড় কৌশলগত লক্ষ্য। আর রিয়াধে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলার পর ট্রাম্প যদি সত্যিই যুদ্ধে নামার সিদ্ধান্ত নেন, তা হলে ইয়েমেনের সংঘাত আরও বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।